ভাইকিং কারা? ইতিহাসে তাদের অবদান কতোটুকু?

মোঃ এরফানুর তালুকদার
মোঃ এরফানুর তালুকদার

শিক্ষার্থী,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

viking

ভাইকিং নামটির সঙ্গে আমরা অনেকই পরিচিত। কিন্তু আমরা কি জানি ভাইকিং কারা? তাদের কাজ কি ছিল? আমেরিকার ইতিহাসে তাদের অবদান কতোটুকু? ৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১১শতক পর্যন্ত ভাইকিংদের আধিপত্য ছিল। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের একটি বিশাল সংখ্যালঘু গোষ্ঠী তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য মাতৃভূমি ত্যাগ করে এবং সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। সমুদ্র সৈকতে বসতি স্থাপনকারী জীবিকার তাগিদে অনবরতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত এসব মানুষরাই ভাইকিং নামে পরিচিত ছিলো।  

উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষত অনির্ধারিত আশ্রম, মঠ, ব্রিটিশ দ্বীপ ইত্যাদি স্থানে ভাইকিংরা অভিযান চালাত। তিন শতাব্দী ধরে তারা ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় মহাদেশের উপর বিভিন্ন ভাবে আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে পটু, আর জাহাজ চালানোর অসম্ভব দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রায় তিনশ’ বছর ধরে গোটা ইউরোপ, আমেরিকা দপিয়ে বেড়িয়েছে তারা।

ভাইকিং নামটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান থেকে এসেছে, পুরনো নরওয়েজিয়ান শব্দ “বিকা” (উপসাগর বা খাদ) থেকে। সভ্যতার মানদন্ডে রীতিমতো অসভ্য আর বর্বর এই জাতি সাগরে অসম্ভব সব দূরত্ব পাড়ি দিয়েছে, নতুন নতুন দেশ আবিষ্কার করেছে। আর এ সমস্ত কিছুই তারা করেছে একদম নিজেদের প্রচেষ্টায়। ভাইকিংরা জাহাজ বানানোতে ছিলো অসম্ভব রকমের পটু। একটা জাহাজ কোন পথে যাবে বা কি পরিমাণ ভার বহন করতে হবে এসব বিবেচনা করে তারা জাহাজ নির্মাণ করতে পারতো। প্রতিটি অভিযান শেষে নিরাপদে ফেরত আসা নাবিকদের মুখে সমুদ্রযাত্রার বিবরণ শুনে সেই রুটের জাহাজের নকশা তৈরী করতো নির্মাতারা। সাধারনত দুই ধরনের জাহাজ বানাতো, তার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিলো ‘ল্যাংস্কিপ’ যেটা ছিলো আদতে যুদ্ধ জাহাজ। এই জাহাজগুলোতে চেপে তারা হামলা করতো বিভিন্ন দেশে।

 

ভাইকিংসরা কোন বংশ বা ধর্মের মতাবলম্বী ছিলো না। তাদেরকে ইউরোপীয়রা নিজেদের স্বজাতি হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। কারন তারা একটি বিদেশী জাতি হিসাবে এসেছিল এবং তাদের কর্মকাণ্ড ছিলো বর্বরোচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল তারা খৃস্টান ছিলো না। ভাইকিংদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল এখনকার সময়ের নরওয়ে সুইডেন এবং ডেনর্মাক হিসাবে পরিচিত এলাকাগুলিতে, এই দেশগুলো একত্রে স্ক্যান্ডিনেভিয়া হিসেবে পরিচিত। তারা যে দেশে বাস করত সেখানকার মাটি ছিলো ভয়াবহ রুক্ষ আর অনুর্বর। সেই সঙ্গে ছিল তীব্র শীতের প্রকোপ। অনেকটা বাঁচার তাগিদেই প্রতি বছর জাহাজে চেপে বিভিন্ন দেশে অভিযানে বের হতো তারা। লুটের মাল যত বেশী হবে, তত আরামে কাটবে শীতের মৌসুম। তাই লুটপাট চালানোর ব্যাপারে তারা ছিলো অসম্ভব নির্মম আর অসভ্য।

ভাইকিংদের ইউরোপে আধিপত্য:

সমুদ্রচারী দস্যুরাই ইউরোপে পরিচিত হয়েছিলো ‘ভাইকিং’ নামে । ভাইকিংদের জাহাজ দেখা আর আজরাইলকে দেখা– এই দুটোই ইউরোপের মানুষের কাছে ছিলো সমান বিষয়। আজকে মার্ভেলের সুবাদে আমরা যে থর, ওডিন আর লোকিদের নিয়ে তৈরী মুভি দেখি, এরাই ছিলো এসব নর্থমেনদের উপাস্য দেবতা । ৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় ইংল্যান্ডের নর্থমার ল্যান্ডের উপকূলে লিন্ডসফার্নে এক সন্ন্যাসীদের আশ্রমে আক্রমণের মধ্য দিয়ে ভাইকিং যুগের সূচনা হয়েছিল।

অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় তারা ছিল অদ্ভুত রকমের আগ্রাসি। আশ্রমের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি তারা কোন শ্রদ্ধা দেখায়নি। এর দুই বছর পরে, তারা স্কি ও আইওনা এবং রাথলিন (আয়ারল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে বন্ধ) এর অনির্ধারিত দ্বীপ, আশ্রম ও মঠ গুলিতে আঘাত হানে। ৮৪০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের ফ্রাইকা (আধুনিক দিনের ফ্রান্স ও জার্মান) -এর রাজা লুইসের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র লোথর তার ভাইদের যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য ভাইকিংদের কাছে এসেছিলেন সাহায্যের জন্য। সংগ্রামের অনেক আগেই ভাইকিংরা বুঝতে পেরেছিল যে ফ্র্যাঙ্কিশ শাসকরা তাদের অর্থ প্রদান করতে ইচ্ছুক। তাই তারা এ সুযোগর সৎব্যাবহার করেন। এর ফলে তাদের প্রভাব ইউরোপে আরও বিস্তৃত হয়।

ভাইকিংরা নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ড অভিযান পরিচালনা করে। নতুন কোনো জনপদ থেকে তাদের একজন অভিযাত্রী বেঁচে ফিরে আসতে পারলেই পরের মৌসুমে তারা সেই রুটে রওনা হয়ে যেতো ড্রাগন জাহাজের বিশাল বহর নিয়ে। আর আক্রান্ত দেশটি নিমেষে পরিনত হতো হাবিয়া দোজখে। ইংল্যান্ড নামের দেশ নিয়ে ভাইকিংদের ভেতর অনেক কথা প্রচলিত ছিলো । তারা জানতো সূর্যাস্তের দিকে সাতদিন একটানা জাহাজ চালালে একটা সবুজ দেশ দেখা যায়। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিজেদের জন্য স্থায়ি বসবাস তৈরি করা । তারা “ওয়াইল্ডস স্কটল্যান্ডের” উত্তরাঞ্চল, হিব্রাইডস্ এবং স্কটল্যান্ডের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। তারাই আয়ারল্যান্ডের প্রথম বাণিজ্যিক শহরগুলির প্রতিষ্ঠা করেছিল।

ডাবলিন, ওয়াটারফোর্ড, ওয়েক্সফোর্ড, উইকলো এবং লিমেরিক ইত্যাদি স্থানগুলো ব্যবহার করে আয়ারল্যান্ড এবং আইরিশ সাগরে সারা ইংল্যান্ডের উপর হামলা চালান হত। আইরিশ উপকূলের উপর তাদের বেস ব্যবহার করে। ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে আক্রমণের মধ্যে দিয়ে ইংল্যান্ড আক্রমনের সূচনা ঘটে। রাজ্য-ওয়েসয়েক্স সফলভাবে প্রথম বারের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছিল। ভাইকিং বাহিনী পূর্ব এঙ্গেলিয়া ও নর্থবারল্যান্ডের জয়লাভ করে। ৮৯৩ সালের কথা, সেবছরেই প্রথমবার সফলভাবে ইংল্যান্ডে পৌছে লুটপাট চালিয়েফেরত আসতে সক্ষম হয় তারা।

ভাইকিংদের সমাপ্তি:

ইংল্যান্ডের ১১০৯ সালের ঘটনাগুলি কার্যকরভাবে ভাইকিংদের সমাপ্তি ঘটায়। তাদের সমাপ্তির পর স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের সমস্ত রাজ্যেই খ্রিস্টান ছিল। এবং ভাইকিং সংস্কৃতিগুলো খ্রিস্টান ইউরোপের সংস্কৃতির রূপ নিয়ে ছিল। আজ, ভাইকিং বংশভুত কিছু মানুষ স্ক্যান্ডিনেভিয়ানের কয়েকটি স্থানে  স্থায়ীভাবে বসবাস করে। এছাড়াও উত্তর ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং রাশিয়া সহ আরো কিছু স্থানে তাদের পাওয়া।

3 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *