শিক্ষার্থী,চুয়েট
ধরো তুমি তোমার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বের হলে। তো খাওয়া দাওয়া না হলে কি চলে! এক বন্ধুর হাতে টাকা দিয়ে পাঠালে সিঙ্গারা আনতে। ও সিঙ্গারা আনার পর জিগ্যেস করলে- ‘কত টাকা রইলো রে?’ বন্ধ হাসি মুখে জবাব দিল এক টাকাও না। মনে সন্দেহ জেগে উঠলো। ‘এই তুই সত্যি বলছিস তো!’ বন্ধু হাসি আরও চওড়া করে বলল ’আমি মিথ্যা বলছি’। ভেবে দেখো তো তার কাছে থেকে টাকাটা উদ্ধার করা সম্ভব কিনা?
যদি তার কথা ’আমি মিথ্যা বলছি’ সত্য হয় তাহলে তার কথা মিথ্যা। অর্থাৎ ’আমি মিথ্যা বলছি’ কথাটাই সত্য হয়ে যায়। কি, confused হয়ে গেলে? হ্যাঁ এটাই Paradox.
Paradox এর কাজই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। তাহলে বন্ধুর কাছে টাকা পাওয়ার আশা বাদ দিয়ে কয়েক মুহুর্তের জন্য তৈরী হয়ে যাও বিভ্রান্তির সাগরে ভাসার জন্য।
অক্সফোর্ডের এক লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক জি. জি. বেরী। একবার তিনি বাট্রান্ড রাসেলের সাথে দেখা করেন। তখন তিনি নিজের পরিচয় জানাবার জন্য রাসেলকে একটি কার্ড দেন। কার্ডে লেখা ছিল ‘এ কার্ডের উর্টো দিকে যা লেখা রয়েছে তা সত্য’। কার্ডটি উল্টে রাসেল দেখলেন তাতে লেখা রয়েছে ‘কার্ডে অপর দিকটায় যা লেখা রয়েছে তা মিথ্যা’। এটাকে বলা হয় Looped liar paradox. এ বিভ্রান্তিটা বোঝা অনেক কঠিন। মানে don’t try this with অশান্ত মস্তিস্ক টাইপের।
কেউ কেউ হয়তো ভেবে নিয়েছো বেরি সাহেব তো ঠিকই লিখেছেন। প্যাচাল পারার কি হল এত! কিন্তু ভেবে দেখো তো- এপিঠে লেখা ছিল অপর পাশের লেখা সত্য, অপর পাশ বলছে এপিঠের কথাটা মিথ্যা। ওপিঠের দাবি যদি সত্য হয় তাহলে এপিঠ মিথ্যা বলছে। আর এপিঠ মিথ্যা বলা মানে তো ওপিঠের কথা সত্য নয়!
মাথাটা ঘুরছে তাই না? এ বিভ্রান্তির মূল ঘাপলা টা আসলে অনেক সূক্ষ। তাহলে এ ঘূর্ণিজাল থেকে মুক্তির উপায় কি? আসলে মুক্তি নেই। কারণ বাংলা ভাষার প্রাকরনিক কাঠোমোতে এর কিনারা করা সম্ভব নয়। বরং বলা যায় বাক্য গুলো অসঙ্গতিপূর্ণ। বেরির বিভ্রান্তির সমাধানও আসলে এটাই- অসঙ্গতি।
ট্রুথ অর ফলস্ এর বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে চলো এবার কিছু ডেয়ার এর গল্প করি। গ্রিক পুরাণের গল্প এটা। প্রমিথিউস নামের একজন টাইটান দেবতাদের কাছে থেকে আগুন চুরি করে এনে মানুষের কাছে দেন। এতে দেবরাজ জিউস ভারি ক্ষেপে যান। দেবতাদের সাধের পবিত্র আগুন, তা কিনা মানুষের সেবায় লাগবে! তিনি প্রমিথিউসকে হত্যা করতে অসীম সংখ্যক দৈত্যের সেনা তৈরী করে প্রথম দৈত্যকে আদেশ করেন- ‘এক ঘণ্টার মধ্যে তুমি প্রমিথিউসকে মেরে ফেলবে’। দ্বিতীয় দৈত্যকে বলেন- ’যদি আধাঘণ্টার মধ্যে প্রমিথিউস না মরে তবে তুমি তাকে মেরে ফেলবে’। তৃতীয় দৈত্যকে বললেন- ‘পনেরো মিনিটের মধ্যে প্রমিথিউস না মরলে তাকে তুমি হত্যা করবে’। এভাবে অসীম সংখ্যক দৈত্যদের আদেশ করে পাঠিয়ে তিনি মাউন্ট অলিম্পসের চূড়ায় বসে তার ছেলেপুলেদের সাথে গল্প করতে লাগলেন। এদিকে দৈত্যরা তো প্রমিথিউসকে মেরে বসে আছে।
কিন্তু সে আমাদের কত্ত উপকার করলো, আমাদের কি উচিৎ না ঘতকদৈত্যটাকে খুঁজে বের করা? তো চলো খুঁজি। ধরি n তম দৈত্য t সময় অপেক্ষা করে প্রমিথিউসকে হত্যা করেছে। তাহলে তো (n+t) তম দৈত্য বাসলে t/2 পরিমাণ সময় অপেক্ষ করেই প্রমিথিউসকে হত্যা করেছে। তাহলে n তম দৈত্য নির্দোষ। কিন্তু এই হতচ্ছাড়া (n+1) তম দৈত্যটা কে? এখানে তো অসীম সংখ্যক দৈত্য। নাহ্ প্রতিশোধ নেয়া হর না তাহলে। RIP প্রমিথিউস! এই paradox কে বলা হয় Benardete’s paradox.
এবার চলো ট্রুথ অর ডেয়ার এর শেষ রাউন্ড খেলি। বলো ট্রুথ না ডেয়ার? ধরলাম- ডেয়ার। তোমাকে এখন একটা কচ্ছপের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। কি অপমানবোধ হচ্ছে? আরেহ বাস্তবে না, কল্পনায় ধরতে হবে। বাস্তবে তো তুমি হয়তো উসাইন বোল্ট কেও টেক্কা দিতে পারবে। কিন্তু আমি এখন দেখাবো একটা কচ্ছপের কাছে তুমি হেরে যাচ্ছো। তাহলে শুরু করা যাক, যেহেতু কচ্ছপ খুব ধীরে দৌড়ায় তাই তাকে একটু সামনে থেকেই দৌড় শুরু করতে দেই। ধরো ৮০ মিটার পিছন থেকে তুমি দৌড় শুরু করলে। আরও ধরো ৮ মিনিটে তুমি ব্যবধান অর্ধেকে কমিয়ে আনলে। এখন তোমার আর কচ্ছপের ব্যবধান ৪০ মিটার। কিন্তু এ সময়েও কচ্ছপ খানিকটা এগিয়ে গেছে। আরও ৪ মিনিট পর তুমি ব্যবধান ২০ মিটার এ কমিয়ে আনলে। কিন্তু এ সময়েও কচ্ছপ খানিকটা এগিয়ে গেছে। প্রতিবার তুমি দূরত্ব অর্ধেক কমাচ্ছো আর কচ্ছপটাও একটু হলেও এগিয়ে যাচ্ছে। কচ্ছপ আর তোমার মধ্যে একটা ব্যবধান রয়েই যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত একটা কচ্ছপ দৌড়ে হারিয়ে দিল তোমাকে।
যাই হোক বাস্তবে ফিরে আসি, পিথাগোরাসের সুযোগ্য ছাত্র জেনো এই প্যারাডক্সের জনক। কচ্ছপের কাছে দৌড়ে হারের লজ্জা ঘুচাবার একটা সুযোগ দিয়ে বিদায় নিচ্ছি। ঘাপলা খুঁজে বের করো। শুভ কামনা রইলো। একটা হোটেলে তিনজন বন্ধুর খাওয়ার বিল এলো ২৫ টাকা। প্রত্যেকে ১০ টাকা করে ৩০ টাকা বের করে দিরে কাইন্টার থেকে ৫ টাকা ফেরত দিল। বেয়ারাকে দুই টাকা টিপ দিয়ে প্রত্যেকে এক টাকট করে ফেরত পেলো। আচ্ছা প্রত্যেকে (১০-১) =৯ টাকা খরচ করলে হয় সাতাশ টাকা আর বেয়ারার টিপ দুই টাকা। আরেক টাকা গেলো কই? ( একমাত্র ক্লু- সমাধান নয় ঘাপলো বের করতে বলেছি)।
প্রতিটি বাঙালির জন্যই দেশকে ,ভাষাকে জানা আবশ্যকীয়। এরই সাথে সাথে সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কেও চাই সম্যক জ্ঞান। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক খুঁটিনাটি আলোচনা জানতে পড়ুন চর্যাপদ ।
আমাদের গবেষনাধর্মী লেখাগুলি পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন