এক এগারো ও মাইনাস টু ফর্মুলা

সোহানুর রহমান জীবন

সোহানুর রহমান জীবন

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Ek egaro

যাদের জন্ম দুই হাজারের পর এবং যারা খুব বেশী রাজনীতি সচেতন নয় তাদের কাছে ওয়ান ইলেভেন একটা অপরিচিত অধ্যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান ইলেভেনের গুরুত্ব ও ঘটনাচক্র কোনভাবেই ফেলে দেয়ার বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

ওয়ান ইলেভেনের ভূমিকা জানতে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ২০০৬ সালের শেষভাগে। দুই হাজার ছয় সালের অক্টোবর মাস। বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেরা বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট তুমুল আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তখন। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঘিরেই ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত সমাবেশের ডাক দিয়েছিলো। এই একই ধরনের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো ব্যাপক সহিংসতা। জ্বালাও-পোড়াও আর হামলায় প্রাণ দিতে হয়েছিলো বহু মানুষকে। সেই সংঘাতের উপলক্ষ ছিল নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বেশকিছুদিনের আওয়ামী জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের পর রাজপথ আওয়ামিলীগের দখলে চলে যায়। কে এম হাসান শেষ পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে আসীন হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।

২৮ অক্টোবরের সহিংসতা

নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানাবিধ কাজকর্ম শুরু থেকেই আলোচিত- সমালোচিত হতে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট আন্দোলন অব্যাহত রাখে। এমতবস্থায় ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি শুক্রবার। বাংলাদেশে এদিনটিই ওয়ান-ইলেভেন নামে পরিচিত। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গঠিত নির্বাচন কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনাস্থা সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের এ দিনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত সরকার।বাতিল করা হয় ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন।

ঘটনাপ্রবাহ

দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, তাতে বলা হয়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন।।

এবং সেদিন সন্ধ্যা থেকেই জরুরি অবস্থা কার্যকর হয়। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ সব মহানগরী ও জেলা শহরে ঘোষণা করা হয় কারফিউ।
প্রসঙ্গত, এই জরুরী অবস্থা জারির পূর্বে রাষ্ট্রপতি মিটিং করেন দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীপ্রধানদের সাথে।এবং নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে সরিয়ে নেন।

গভীর রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ সুগম করতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরদিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ নেন ফখরুদ্দীন আহমদ।

ফখরুদ্দিন আহমেদ-মঈন উদ্দিন আহমেদ

রাজনৈতিক প্রভাব ও গনতন্ত্রের মৃত্যু

জরুরি অবস্থা জারির পর রাজনৈতিক দলগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।মোটামুটি গনতন্ত্রের চর্চা বন্ধ হয়ে যায় দেশে।শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। দুর্নীতির অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আওয়ামী ও বিএনপিপন্থী নেতাদের অনেকেই গ্রেফতার হন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও গ্রেপ্তার হন সেনা নিয়ন্ত্রিত এই সরকার কর্তৃক। এবং এ সময়ই আলোচনার শীর্ষে চলে আসে মাইনাস টু ফর্মুলা।

মাইনাস টু ফর্মুলা কী?

ওয়ান ইলেভেনের পর যখন দুই নেত্রীই কারাবন্দী, ঠিক তখনই প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এক কলাম লিখে বসেন”দুই নেত্রীকেই সরে দাড়াতে হবে” এমন শিরোনামে।এছাড়াও মাহফুজ আনামসহ আরো কথিত সুশীলগন এই মাইনাস টু ফর্মূলাকে সাপোর্ট করে সেই সময়। রাজনৈতিক সংস্কার আনার প্রয়োজনে,সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য মাইনাস টু জরুরী বলে তারা মতামত দেয়। কিন্তু এই সময়ে এসে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এক বাক্যে স্বীকার করেন যে, মাইনাস টু ফর্মুলা মূলত সেনা-নিয়ন্ত্রিত তৎকালীন সরকারের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী করবার জন্যই হাতে নেয়া হয়েছিল। যদিও তারা দিনশেষে ব্যার্থ প্রমানিত হয়।

মাইনাস টু এর ব্যাপারে তৎকালীন সেনাপ্রধানের বক্তব্য

ড: ফখরুদ্দিন আহমেদ সরকার প্রধান থাকলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। কেন তারা ২ নেত্রীকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন, সেটির পরিষ্কার কোন জবাব তার মুখ থেকে পাওয়া কখনোই পাওয়া যায়নি। তবে মইন ইউ আহমেদ তার প্রকাশিত একটি বইতে লিখেছেন যে, তাদের চলার পথে কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকলেও সফলতাই ছিল বেশি। সে বইয়ের তিনি লিখেছেন, তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সব কাজে সহযোগিতা করা কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নয়।

সারকথা

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হলেও, বিভিন্ন মহল থেকে আন্দোলন গড়ে ওঠে।বিশেষ করে ছাত্ররা দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে অনির্বাচিত এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে। এই দাবির মুখে, ফখরুদ্দিন ও মইন ইউ আহমেদের অনির্বাচিত সরকার দ্রুত নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। মুক্তি পান দুই প্রধান দলের নেত্রীগন। প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর বিদেশে পালিয়ে যান ফখরুদ্দিন আহমেদ। অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামীলীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত হবার সাথে সাথেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং টেলিফোন করেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে।শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে মি. সিং বলেন, তার সরকারের সাথে কাজ করার জন্য দিল্লী তাকিয়ে আছে। ফখরুদ্দিনের কী হলো তারপর?? অনেকেই বলেন,আওয়ামিলীগ সেফ এক্সিট দিয়েছিলো ফখরুদ্দিনকে। তারপর আর সে বাংলাদেশে আসেনি।

শপথ প্রদান অনুষ্ঠান

কী নোট( প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা)

উনত্রিশে অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এরকম – “মুখে কাপড় বাঁধা জামায়াত-শিবির কর্মীদের হাতে দেখা গেছে রিভলভার, পিস্তল ও শটগান।
তবে ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ এজ বলেছে ভিন্ন কথা। (এছাড়াও বেশ কিছু পত্রিকায় অস্ত্রধারীদেরকে আওয়ামীলীগের বলে চিহ্নিত করা হয়।) পত্রিকাটির শেষ পাতায় অস্ত্র হাতে এক যুবকের ছবি ছাপা হয়েছিল। সেখানে ছবিটিতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের একজন কর্মী প্রতিপক্ষের দিকে গুলি করেছে।প্রথম আলোর প্রোপাগান্ডার মূলে ছিল মতিউর রহমানের  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ক্ষমতালিপ্সা