খুবই সহজ-সরল এবং বিনয়ী হিসেবে সমাজে খ্যাতি সৃষ্টি হয়েছে রাফিদের। ছোটবেলা থেকে বড়দের শ্রদ্ধা এবং আনুগত্যের মাধ্যমে সকলের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে সে। তার উপর শৈশবকাল থেকে অত্যন্ত মেধাবী এই রাফিদ এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে মহল্লার সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মহল্লার সবাই তাকে নিয়ে অত্যন্ত গর্ববোধ করা শুরু করেছে। করবেই না বা কেনো? যে মহল্লা থেকে আজ পর্যন্ত কেউ কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভার্সিটির মাটিতে পা রাখার সুযোগ পায় নি, আর সে কিনা প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পছন্দের বিভাগে ভর্তি হয়েছে। তাই মহল্লায় আনন্দ যেনো স্বর্গ থেকে নেমে এসে শিহরিত করছে প্রতিটি হৃদয়কে। কিন্তু এই স্বর্গীয় আনন্দের মাঝেও কিছু কিছু হৃদয় নরকানলে দগ্ধিভূত হচ্ছিল ক্ষণে ক্ষণে। সামান্য প্রাইমারি স্কুলের পিয়নের ছেলের এতোবড় সাফল্যই ছিল ঈর্ষান্বিত হৃদয়গুলির মূল কারণ। এ সব ভাবতে ভাবতেই রাফিদ ট্রেনের জানালা দিয়ে লক্ষ করল তার গন্তব্যস্থানে সে প্রায় পৌছে গেছে। সারারাত ট্রেনের ঝক-ঝকানি শেষে সামনেই তার বাবা-মা এবং ছোট বোনের স্নেহ বিজড়িত গ্রামে পৌছে যাবে সে।।
ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হতে এখনো ২ মাস বাকি। তাই এই অবসর সময়টা গ্রামের বন্ধু-বান্ধবের সাথে আনন্দ করে কাটিয়ে দেয়ার জন্য রাফিদ চলে এসেছে গ্রামের বাড়িতে। বাড়িতে পৌঁছেই বাবা-মার স্নেহসিক্ত সন্তান হৃদয়ে নতুন দোলা অনুভব করে। যে দোলা হৃদয়ে ছিলো না অনেকদিন যাবৎই। সেই যে কবে মায়ের রান্না খেয়েছিলো সেটাও প্রায় ভুলতে বসেছে। যদিও সময়কালটা ছিল মাত্র ১৫ দিনের। তবুও রাফিদের কাছে সেটা ছিল ১৫ বছরের মতো বাবা-মায়ের স্নেহশূন্য বিরতিকাল।
তাই বহুদিন পর মায়ের হাতের রান্না খেয়ে ক্ষুধার্ত উদর ও অন্তরকে শীতল করে চারপায়ির উপর বিশ্রামে মগ্ন হলো। বিকাল হতে না হতেই তার উদগ্রীব মন বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলো। দেখাও হলো সবার সাথে। রসালো, রোমান্টিক, আজগুবি আর অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প মেতে উঠলো তাদের আসর। গল্প-আড্ডা-ঘুরাঘুরি এবং বাদামভোজ শেষে দিবসান্তে বন্ধু মিজানের সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো, রাতে স্কুলমাঠে ব্যাডমিন্টন খেলার দাওয়াতটাও সঙ্গে নিয়ে গেলো। যেতে যেতে দুই বন্ধু গল্প শুরু করলো ফের। কিন্তু এবার চ্যাপ্টার চেঞ্জ। রাফিদ জিজ্ঞেস করলো তার ভালো লাগা সেই শারলিনের কথা, যে কিনা নারীজাতির প্রচলিত প্রথাকে ভেদ করে তার ভালোবাসার কথাটা প্রথমেই জানিয়েছিল রাফিদকে। রাফিদের শুষ্কমনেও তখন সৃষ্টি হয়েছিল অজানা এক অনুভূতির আদ্রতা। সেও ভালোবাসতো শারলিনকে। মনে মনে তাকে নিয়ে বুনেছিল অনুভব আর প্রত্যাশার বীজ।
কিন্তু পরিবার, সমাজ এবং নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার অদম্য বাসনা সেই বীজকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ঠেলে দিয়েছিল অবহেলার স্তুপে। তবুও আজ ফের সেই আশা উজ্জীবিত করার প্রত্যয়ে বন্ধু মিজানকে তার মনের অব্যক্ত কথাটা প্রকাশ করলো। কিন্তু রাফিদ বুঝতে পারলো না তার হৃদয় শীতল করা সেই শারলিন আজ আর তার নেই, এতদিনে অন্য কারো শীতল মনকে ভালোবাসার উষ্ণতায় রাঙিয়ে দিয়েছে। আর সেই রঙিন অন্য কেউ যে রাফিদের প্রিয় বন্ধু মিজান, সেটা ছিল সম্পূর্ণ ধারণার বাইরে। রাফিদের কাছ থেকে হঠাৎ শারলিনের ব্যাপারে এমন অনাকাঙ্খিত আশার কথা শুনে মিজান হকচকিত হয়ে গেলো। সেও জানে শারলিন এখনো রাফিদকেই ভালোবাসে। তাই যেভাবেই হোক শারলিনকে এসব বিষয়ে জানতে দেয়া যাবে না, এমন চিন্তা করতে করতে রাফিদকে তার বাড়ি রেখে নিজের বাড়ির পথে যায় মিজান। কিন্তু সে তার বাড়িতে না গিয়ে সোজা চলে যায় বন্ধু সুজনের বাড়ি। রাফিদের সব আশা এবং ভালোবাসার কথা সুজনের কাছে ব্যক্ত করে আর নিজের ভালোবাসা হারালে অতৃপ্ত অন্তরে খরস্রোতা নদীর মতো রিক্ত হওয়ার কল্পনায় দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। তাই শারলিনকে হারানোর কথা চিন্তাই করতে পারেনা মিজান। অবশেষে মিজান আর সুজন বন্ধুত্বের আড়ালে দুর্ধর্ষ এক পরিকল্পনা গ্রহণ করে, আকাশে-বাতাসে যেনো বিশ্বাসঘাতকার নির্মম গন্ধ ছড়াতে থাকে।
প্রদোষের হালকা আভা কেটে তিমির রজনীর কুহেলিকায় তিনবন্ধু বের হয়ে গেলো স্কুল মাঠের উদ্দেশ্যে। হালকা হালকা কুয়াশাঘেরা শীতলতার মাঝে একটু উষ্ণতাকে আলিঙ্গন করতে ব্যাডমিন্টন এর কোনো জুড়ি নেই। তাই বন্ধুরা মিলে উষ্ণতার অনুভূতিতে একাকার হয়ে খেলতে থাকলো এই প্রিয় খেলা। রাতের গভীরতা বাড়তে বাড়তে খেলার গতি যেনো কুসুম কলির ঘ্রাণের মতো ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়ের চারিদিক। সারারাত যেনো চলতে থাকলো তাদের মৃদু উচ্ছ্বাসতা।
সেদিন রাতে আর কিন্তু বাড়ি ফেরে না রাফিদ। মা-বাবা ভাবলো এতোদিন পর বাড়ি এসে ছেলেটা মনে হয় বন্ধুদের সাথে খেলা করে কোনো বন্ধুর বাসায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই আর রাতে খোঁজার চেষ্টা করেনি তাকে। কিন্তু সকালে যখন স্কুল মাঠের ধারে আখ ক্ষেতে একটা মৃত লাশের কথা মানুষের মুখে উচ্চারিত হতে থাকে, তখন রাফিদের মায়ের মনে অজান্তে কোনো এক অদৃশ্য সত্তা চিড়িক দিয়ে ওঠে।
সাথে সাথে ছুটে গিয়ে স্কুল মাঠের ধারে পড়ে থাকা দেহ- মস্তক বিচ্ছিন্ন রাফিদকে দেখে মাথা বিগড়ে যায় তার বাবা-মায়ের। বাকরুদ্ধ হয়ে যান তাঁরা। যেনো আকাশের সমস্ত ওজন তাদের উপরে ভর করে বসে। মুখ দিয়ে বের হয় না কোনো বুলি। আর সাধারণ জনতার কলরোল যেনো দ্বিখণ্ডিত করে তাদের সদ্য ঝাজরাকৃত হৃদয়। কাল রাত থেকে রাফিদের বন্ধু মিজান এবং সুজন ও লাপাত্তা। এসব শুনে নিজেকে কিছুটা শক্ত করে হলেও রাফিদের বাবা মৃত সন্তানের কপোলে হাত বুলিয়ে আধো আধো এক বুলিতে বলে ফেললেন, “রাফিদ,ও রাফিদ ওঠ বাবা! এই দেখ আমি তোর বাবা এসেছি তোকে নিতে, বাড়ি যাবিনা?”
হঠাৎই বাবার ডাক শুনে অসম্ভব ভাবে নড়ে ওঠে রাফিদ। চেয়ে দেখে নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকা ট্রেনের ভিতরে বসে আছে সে। ট্রেনটা একটা স্টেশনে দাড়িয়ে আছে। স্টেশনটা চেনা চেনা লাগে খুব। চোখ দুটি একটু মেলে দেখে তার বাবা তার সামনে দাড়িয়ে আছে।পাশে মিজান ও সুমন ও সুমন আছে।তারা তাকে নিতে এসেছে। তৎক্ষনাৎ তার বাবা তাকে ডেকে বলল,”রাফিদ, ওঠ বাবা।ওঠ। আমি চলে এসেছি। বাড়ি যাবি না? ট্রেন তো ছেড়ে দিবে। তাড়াতাড়ি চল্”।
প্রতিটি বাঙালির জন্যই দেশকে ,ভাষাকে জানা আবশ্যকীয়। এরই সাথে সাথে সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কেও চাই সম্যক জ্ঞান। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক খুঁটিনাটি আলোচনা জানতে পড়ুন চর্যাপদ ।
আমাদের গবেষনাধর্মী লেখাগুলি পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে সাবস্ক্রাইব করে রাখুন