সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহঃ অবিভক্ত বাংলার প্রথম শাসক

সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ

সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ

মধ্যযুগের বাংলার সুলতানী শাসনামলের কথা উঠলেই স্মরণে আসে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নাম। তাকে সর্বপ্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদের রুপকার ও বলা হয়ে থাকে। এই প্রবন্ধে আমরা সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানার চেষ্টা করবো যা বাংলার ইতিহাসের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে আছে।

সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ কে ছিলেন?

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সাল থেকে ১৩৫৮ সাল পর্যন্ত বাংলাকে শাসন করেন।তার পূর্বপুরুষ সম্পর্কে খুব বেশী তথ্য পাওয়া যায়না।

তবে জানা যায় শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ পূর্ব পারস্যের( বর্তমান ইরান) সিজিস্তান শহরের এক সম্ভান্ত্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।তার নাম ছিলো ইলিয়াস শাহ, বাংলার সিংহাসনে আরোহন করে তিনি নিজেকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ নামে ঘোষনা করেন। ইলিয়াস শাহ কখন, কিভাবে ভারতবর্ষে আসেন তাঁর সমকালীন কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে গোলাম হোসেন সলিম এর “রিয়াজউস—সালাতীন” গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, হাজী ইলিয়াস ও তাঁর এক দুধভাই আলী মুবারক এক সময় দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুগলকের ভৃত্য ছিলেন। কিন্তু এসময় কোন অপকর্ম করে(ধারনা করা হয় নারীঘটিত কোন ব্যাপার) হাজী ইলিয়াস জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যান। এর ফলে ফিরোজ শাহ হাজী ইলিয়াসকে ধরে আনার জন্য আলী মুবারককে আদেশ করেন। আলী মুবারক হাজী ইলিয়াসকে খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হলে ফিরোজ শাহ আলী মুবারককে বিতাড়িত করেন। অতঃপর আলী মুবারক বাংলায় চলে আসেন এবং লখনৌতির শাসনকর্তা কদর খানের অধীনে চাকরি লাভ করেন। অল্পকালের মধ্যেই আলী মোবারক কদর খানের আস্থাভাজন হন এবং কালক্রমে প্রধান সেনাপতির পদ লাভ করেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের সাথে এক যুদ্ধে কদর খান নিহত হলে তাঁর সেনাধ্যক্ষ আলী মুবারক ‘সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহ’ উপাধি গ্রহণ করে লখনৌতির সিংহাসনে বসেন।

সুলতান ইলিয়াস শাহের ক্ষমতায় আরোহন

ভাই আলী মোবারক লখনৌতির শাসক হলে ইলিয়াস শাহ কিছুকাল পরে দিল্লি হতে বাংলায় আসেন কিন্তু আলী মুবারক তাঁকে বন্দি করেন। পরে তাঁর মাতার অনুরোধে আলী মুবারক তাঁকে ছেড়ে দেন এবং উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করেন। ইলিয়াস শাহ ছিলেন একজন যোগ্য সমরকুশলী ও সেনাপতি। তিনি লখনৌতির আলাউদ্দিন আলী শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং যুদ্ধে জয়লাভ করে “লখনৌতি- সপ্তগ্রামের” সিংহাসনে আরোহন করেন ১৩৪২ সালে। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ যখন বাংলার সিংহাসনে বসলেন তখন দিল্লিতে তুঘলক বংশের শাসন চলছিল। তুঘলক বংশটি ১৩২০ সাল থেকে ১৪১৪ সাল অবধি দিল্লির ক্ষমতায় টিকে ছিল। তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক (১৩২০-২৫); ইনি বাংলায় দিল্লির আধিপত্য কায়েম করেছিলেন এবং বাংলাকে তিনটি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন। (ক) লক্ষ্মণাবতী; (খ) সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম; (গ) সোনারগাঁও। এই তিন প্রদেশের রাজধানীও ছিল আলাদা এবং শাসনকর্তা ছিলেন তিনজন। এরা ছিলেন দিল্লির অধীনস্ত এবং এই তিনজন শাসনকর্তার মধ্যে বিরোধ অব্যাহত ছিল। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এই সুযোগটি গ্রহন করলেন। এবং বাংলার তিনটি প্রদেশ জয় করে বাংলাকে একীভূত করে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি গ্রহন করলেন। বাংলার ইতিহাসে বাংলা এই প্রথম ‘বাঙ্গলা’ নামে পরিচিত হল। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা সন্দেহ নেই। কেননা, এর আগে বাংলা প্রাচীন কাল থেকে গৌড়, পুন্ড্র, বঙ্গ এসব জনপদে বিভক্ত ছিল।সে যাই হোক সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ স্বাধীনভাবে বাংলায় রাজত্ব করতে লাগলেন।

 

রাজ্যের বিস্তৃতি

আগেই যেরকমটি বলেছি, সুলতান ছিলেন একজন দক্ষ সেনাপতি। তাই রাজ্যের বিস্তার ছিলো তার ধ্যান ও জ্ঞ্যান।পুরো বাংলার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর ইলিয়াস শাহ রাজ্য বিস্তারের জন্য বাংলার বাইরে অভিযান প্রেরণ করেন। দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক তখন নানাবিধ বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত আর সুলতান ব্যস্ত ছিলেন রাজ্যজয়ে। সুলতান ইলিয়াস শাহ বিহারেও সাফল্যজনক অভিযান প্রেরণ করেন। বিহারের সাফল্যে ইলিয়াস শাহের রাজ্য জয়ের নেশা পেয়ে বসে।এরপর নেপাল জয় করেন তিনি ১৩৪৬ সালে। কাঠমুন্ডু শহরে জয়রাজ দেবকে পরাস্ত করে নিজের দখলে নিয়ে নেন। তিনি উড়িষ্যা আক্রমণ করে চিল্কা হ্রদ পর্যন্ত অগ্রসর হন,যদিও উড়িষ্যা দখলে নিতে পারেননি শেষ পর্যন্ত।ফিরোজ শাহ তুঘলকের সাথে সংঘর্ষ

ইলিয়াস শাহের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে দিল্লির সুলতান ফিরোজশাহ তুগলক। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে বিশাল সেন্যবাহিনী নিয়ে ইলিয়াস শাহকে দমন করতে বঙ্গ অভিযানে আসেন। ইলিয়াস শাহ তাঁর সুরক্ষিত একডালা দূর্গে আশ্রয় নেন। ফিরোজশাহ পান্ডুয়া দখল করে একডালা আক্রমণের জন্য অগ্রসর হন। বহু চেষ্টা করেও ফিরোজ শাহ দূর্গটি দখল করতে ব্যর্থ হয়ে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দে সন্ধি স্থাপন করে দিল্লিতে ফিরে যান।

একডালা দূর্গ

ইলিয়াস শাহের অনন্য কৃতিত্ব

শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ বুদ্ধি, শৌর্য,ব্যক্তিত্ব ও কর্মদক্ষতার দ্বারা সামান্য অবস্থা থেকে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেন। সামান্য আঞ্চলিক শাসক থেকে সমগ্র বাংলা দেশকে একত্র করে শাসনকর্তা হওয়া এক বিস্ময়কর ব্যাপার। শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন বিচক্ষণ ও জনপ্রিয়।   তাঁর শাসনামলে বাংলায় শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। তাঁর নিরপেক্ষ সুশাসনে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে প্রীতির এক মেলবন্ধন গড়ে উঠেছিল। দূর দৃষ্টি সম্পন্য শাসক ইলিয়াস শাহ ফিরোজ শাহের আক্রমণের হাত থেকে বাংলাকে রক্ষা এবং পরবতীর্কালে তাঁর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন। ইলিয়াস শাহ একজন ধার্মিক ও নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। ফকির ও দরবেশগণকে তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। পীর আখি সিরাজউদ্দিন ও তাঁর শিষ্য শায়খ আলাউল হক এবং শায়খ রাজা বিয়াবানী এদেশে আগমন করে তাঁর দরবার অলংকৃত করেন। তিনি তাঁদের সম্মানে রাজ্যময় খানকাহ, মসজিদ ও মাদ্রাসা স্থাপন করেন। অনেকে বলে থাকেন তিনি মঠ,মন্দির ভাঙচুর করতেন। এ ব্যাপারে কোন তথ্য পাওয়া যায়না তবে নেপালে একটি মন্দিরে হামলা চালান তিনি রাজ্য জয়ের জানান দিতে যা ওই সময়ের রীতি ছিলো। তার নিজ অঞ্চলের কোন বিধর্মীদের উপাসনালয়ের ভাঙচুর অথবা ক্ষতি সাধনের কোন ইতিহাস পাওয়া যায়না। যদিও সুলতানী আমলের সূচনা করেন ফখরদ্দিন মুবারাক শাহ কিন্তু সুলতানি যুগের যোগ্য প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তাকেই বিবেচনা করা হয়।ইলিয়াস শাহ বাংলার ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

 

জামায়াতে ইসলামীকে কেন ক্ষমতায় আনা দরকার?

এই বাংলার জনপদে নানান সময় ইসলামপন্থীরা নানাবিধ উপায়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা করেছেন। তীতুমীরের বাঁশেরকেল্লা থেকে শুরু করে শাপলার

আরও পড়ুন »

আদিবাসী নাকি উপজাতিঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী প্রশ্নের চূড়ান্ত সমাধান কী?

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী অঞ্চল। যেখানে প্রায় ১৩ টি উপজাতির বসতি। এছাড়াও দেশের আরো কিছু জায়গা মিলে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ টি

আরও পড়ুন »

নেলি গণহত্যাঃ সংখ্যালঘু হত্যার নিকৃষ্ট উদাহারণ

শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার কারনে একদিনে প্রায় পাঁচহাজার মানুষের জীবন দিতে হয়েছে। বিশ্বাস করবেন? এমনটাই ঘটেছিলো ১৯৮৩ সালের ১৮ ই

আরও পড়ুন »
ইশারাত মঞ্জিলঃ মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাসের পুনর্পাঠ

ইশারাত মঞ্জিলঃ মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাসের পুনর্পাঠ

মধুর ক্যান্টিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ঐতিহাসিক এক স্মৃতির ফলক । মধুর ক্যান্টিনকে অনেকেই ছাত্ররাজনীতির আতুরনিবাস বলে থাকেন। মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাস

আরও পড়ুন »